বিপ্লব সেন গুপ্তর লেখা ”শতবর্ষের কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’

শতবর্ষের কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।।
।। বিপ্লব সেন গুপ্ত।।

‘একবার মাটির দিকে তাকাও/ একবার মানুষের দিকে /#/এখনও রাত শেষ হয়নি,/অন্ধকার এখন ও তোমার বুকের ওপর/কঠিন পাথরের মতো, তুমি নিশ্বাস নিতে/ পারছ না/মাটির ওপর এক ভয়ঙ্কর কালো আকাশ।/এখন ও বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে বসে আছে।/তুমি যেভাবে পারো এই পাথরটাকে সরিয়ে দাও/ আর আকাশের ভয়ঙ্কর কে শান্ত গলায় এই/ কথাটা জানিয়ে দাও….. / তুমি ভয় পাও নি।…’ (জন্মভূমি আজ…) অথবা—‘এক অদ্ভুত মাটির উপর/ আমরা দাঁড়িয়ে আছি/ অর্থাৎ দাঁড়িয়ে থাকার জন্য/ প্রাণপণ চেষ্টা করছি…’ এই কবিতার কবি—আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্ম গ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে ১৯২০ সালের ২ সেপ্টেম্বরে। যদিও তাঁর বাল্যবয়সে স্কুলের পড়াশোনা ও কলেজের ছাত্রজীবন কাটে কলকাতার রিপন স্কুল ও কলেজে। লেখা-পড়ার সাথে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী অনুশীলন দলের সঙ্গে যুক্ত হন।পরেবামপন্থী রাজনীতির সাথে যোগদান করেন,পাশাপাশি কবিতা লিখে গিয়েছেন। সে সময় তিনি ঢাকুরিয়ায় বসবাস করতেন।

তাঁর কবি-জীবন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নানা কারণে স্মরণীয়। বিশেষ ভাবে তিনি ছোট পত্রিকার কবি হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেন। সে সময় বড়ো প্রতিষ্ঠানের কোনও পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়েও তিনি অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তাঁর একটি কবিতা তুলে ধরে জানাচ্ছি, এই ‘সাগ্নিক’ নামে কবিতাটি লেখা হয়েছিল ৩০ এপ্রিল, ১৯৭৪ সালে। যা, কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণ কমিটি, ২-ই নবীন কুন্ডু লেন, কলকাতা- ৯, সুভেনিয়রে প্রকাশিত। ‘অস্থির হয়ো না;/ শুধু প্রস্তুত হও!/ #/ এখন, কান আর চোখ/ খোলা রেখে/ অনেক কিছু দেখে যাওয়ার সময়/ #/ এ সময়ে/ স্থির থাকতে না পারার/ মানেই হল, আগুনে ঝাপ দেওয়া/#/ তোমার কাজ/ আগুনকে ভালবেসে উন্মাদ হয়ে যাওয়া নয়—/ আগুনকে ব্যবহার করতে শেখা/#/ অস্থির হয়ো না/ শুধু, প্রস্তুত হও!’ আহা! মনে গেঁথে যায়, বিস্ময়তা…

তবে প্রথম দিককার কবিতায় এসেছে প্রেম ও স্মৃতি। পরের দিকে কবিতায় এসেছে মানুষ ও স্বদেশ। কবির কাব্যজগত— প্রেম, প্রকৃতি, সমাজ আন্দোলন, চারপাশের মানুষ, তুচ্ছ ছোট্ট ঘটনা, পৃথিবীর নানা স্পন্দন হত্যাদি ঘিরে। তাঁর কাব্যকে ঘিরে আছে তাঁর সমাজ সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা। একটা ছোট্ট কবিতা তুলে ধরছি—‘মানুষ’ নামে— ‘তার ঘর পুড়ে গেছে/ অকাল অনলে/ তার মন ভেসে গেছে/ প্রলয়ের জলে/ তবু সে এখনও মুখ/ দেখে চমকায়/ এখনও সে মাটি পেলে প্রতিমা বানায়…’ তাঁর কাব্যকে ঘিরে দেখি, তীব্র সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা। সমাজতন্ত্রের উপর বিশ্বাস আর আস্থাই তাঁর কবিতা এবং জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

দেশভাগ, ১৯৫৯-এর খাদ্য আন্দোলন থেকে শুরু করে বন্দি মুক্তি আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন থেকে শুরু করে বন্দি মুক্তি আন্দোলনে অংশ নিলেও তিনি কখনই সাংঘাতিক পার্টিজান হয়ে জাননি। নিজের কথা নিজের মতো করে বলেছেন কবিতায়। তাঁর বিভিন্ন পর্বের কবিতা পর্যালোচনায় ঢোকার আগে তাঁর ‘শ্রেষ্ট কবিতা’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকাটি পড়া ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ— ‘শুধু বেঁচে থাকাটাই একজন মানুষের অন্বিষ্ট নয়।নিজের ছোট্ট চিলে কোঠার ঘরটিতে বসে একতারা বাজিয়ে সারাজীবন প্রেম আর অপ্রেমের গান গাওয়া— তাও নয়। মানুষ কোনও ঈশ্বর প্রেমিক বৃক্ষ নয়, সারাজীবন ধরে তাকে রাস্তার পর…’ — যা পড়লে তাঁকে চেনা যায় বৈকি! তাঁর এই দৃঢ় বিশ্বসের জন্যই তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রত্যক্ষ যোগদান। জেল যাত্রা এবং কবিতা। এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর দলের সঙ্গে মতবিরোধ এবং নিজেকে দল থেকে সরিয়ে নেওয়া।

১৯৮০-র ফেব্রুয়ারিতে ‘সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী কবিতা সংকলন (১)’ শীর্ষক একটিফোল্ডারে কবিতাটা প্রকাশিত হয়েছিল। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণ কমিটির সৌজন্যে কবিতাটা পেলাম ফেসবুকে। আজকের পরিস্থিতিতে কবিতাটা খুবই প্রাসঙ্গিক—
‘যে যত পারো লুটেপুটে যাও/ আর/ তােমার পড়শীদের ঘরবাড়ি,বৈঠকখানা,অন্দরমহল/ সে-তো তােমাদের মজা লুটবার জন্যই হে !/তােমাদের মানে তােমার আর তার/অর্থাৎ যাদের গায়ে জোর আছে।/ এ নিয়ে অবশ্যই মাঝেমধ্যে ঝামেলা হবে,/তিনি তোমাকে চোখ লাল করে ধমক/ দেবেন।/কিন্তু তোমার তাতে কী যায় আসে?/তোমার পেটের ভেতরেই তো তখন/ পড়শিদের/ঘর- বাড়ি, বৈঠকখানা, অন্দরমহল!/ছিটেফোঁটা এর পরেও কিছু পড়ে থাকলে/তােমাদের দুই শরিকেরই লাভ।/আর যদিই বা ব্যাপারটা অন্য রকম ঘটে/অর্থাৎ, একটা বিশ্রীরকমের ফৌজদারী/ লড়াই/বেধে যায়,/ ততটুকু ঝক্কি, যাদের গায়ে জোর আছে/ তাদের নিতেই হয়।/ তার আগে/ এখন তো লুটেপুটে খেয়ে নাও!/ এই তো সুবর্ণ সুযোগ!/

তাঁর ‘রাজা আসে যায়’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে এক প্রবাদ বাক্যের স্থান করে নিয়েছে। এ ছাড়া তাঁর লেখা ‘উলুখড়ের কবিতা’,’লখিন্দর’,’জাতক’,’সভা ভেঙে গেলে’,’মানুষ খেকো বাঘেরা বড় লাফায়’,’এই জন্ম জন্মভূমি’,’পৃথিবী ঘুরছে’,’ভিয়েতনাম ভারতবর্ষ’,’শীত বসন্তের গল্প’,’বেঁচে থাকার কবিতা’,’আর এক আরম্ভের গল্প’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কাব্য।

তাঁর বহু কবিতায় সুর সংযোজন করে গান পরিবেশন করেছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অজিত পান্ডে, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, অসীম ভট্টাচার্য ও অমিত রায় সহ প্রমুখ বিশিষ্ট গণসঙ্গীত শিল্পীরা।

তাঁর বিপুল সংখ্যার কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। সেই কাব্যগ্রন্থগুলো বেশির ভাগই ক্ষীণকায়। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ— গ্রহচ্যুত (১৯৪২), রাণুর জন্য (১৯৫২), লখিন্দর (১৯৫৬), ভিসা অফিসের সামনে (১৯৬৭), মহাদেবের দুয়ারে (১৯৬৭) মানুষের মুখ (১৯৬৯), ভিয়েতনামঃ ভারতবর্ষ (১৯৭৪), আমার যজ্ঞের ঘোড়া (১৯৮৫)। এছাড়াও তিনি অনেক কাব্যগ্রন্থ অনুবাদও করেছেন। তাঁর সম্পাদিত কাব্য সংকলনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ‘ব্রাত্য পদাবলী (১৯৮০)। কবি অতীন্দ্র মজুমদারের সহ সম্পাদনায় তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘মে দিনের কবিতা’ (১৯৮৬)। তাঁর এই সম্পাদিত কবিতা বুলেটিনের সংখ্যা প্রায় ২৫-এর বেশি। ১৯৮২ সালে তিনি পঃ বঃ সরকারের রবীন্দ্র পুরষ্কারে সম্মানিত হন।
‘চোখের জলে একা/ ছায়ার মত সে/ যেন শীর্ণ তরু/ বৃষ্টিতে ভিজছে/#/ চারদিকে তার গভীর/ ঘুমের শূন্যতা/ যেন আকাশ জুড়ে/ নেমেছে সন্ধ্যা…’ শিরোনাম মনে নেই সসম্ভবতঃ ১৯৮৩-৮৪ সালে কবির রচনাটি মনে পড়ে গেল। চারিদিকে কবিতা, গান, আবৃত্তি, আলোচনা সহ কবিকে সকলেই শ্রদ্ধা নিবেদন করে গেলেন এ মাসের ২ সেপ্টেম্বরে তাঁর শতবর্ষের জন্মদিনে হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে…

সব কবিরই কবিতায় তত্ত্ব বা দর্শন থাকেই। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় এই তত্ত্ব বা দর্শন তাঁর কবিতার কাধে চড়ে বসেনি। এক ধরনের ঋজুতা ও সারল্যই তাঁর কবিতার মস্ত বড়ো সম্পদ। কবির কথায়— ‘ভিশন, মিশন, প্যাশন এই তিন্টির একটা কোনও কবির কবিতায় প্রবল ভাবে থাকলে সে কবিতা পাঠককে টানবেই। … আধুনিক সভ্যতার কাছ থেকে আমরা অনেক শিখেছি কিন্তু আমাদের আত্মাকে হারিয়েছি। আমাদের বুকের মধ্যে প্রেম বাঁশির মতো মাদলের তো নিজে থেকে বাজে না।’… অনুপ্রেরণা যোগায়।

তাঁর লেখা ‘দুর্দিন চিরকাল থাকে না’ কবিতাটি আজও মনে হয় সমকালীন- সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক— ‘যখন দুর্দিন ঘনিয়ে আসে/ তখন মাথা ঠান্ডা রাখাই সব চেয়ে জরুরী কাজ/#/ যাদের মুখে সব সময় কথার খই ফোটে/ তাঁদের দরকার তখন কিছুদিনের জন্য বাক সংযম অভ্যাস করা/#/ দুর্দিন আসছে, এই খবরটুকু যাঁদের কানে পৌঁছে দেওয়ার মানুষ ছিল না,/ তাঁরা কবি, অধ্যাপক, রাজনীতির পন্ডিত অথবা নেতা যা-ই হোন না কেন,/ তাঁদের উচিত এখনও কিছুদিন নিজেদের ভাবনাগুলিকে যাচাই করে নেওয়া…’ তিন ডিসেম্বর ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত।

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই (নিম্নে) কবিতাটি এখন অবধি প্রকাশিত কোনো বইয়ে গ্রন্থিত হয়নি। কবিতার নাম— ‘জন্মভূমি আজ…’/
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়/ ‘একবার মাটির দিকে তাকাও/একবার মানুষের দিকে।/#/এখনও রাত শেষ হয়নি,/ অন্ধকার এখন ও তোমার বুকের ওপর/ কঠিন পাথরের মতো, তুমি নিশ্বাস নিতে/ পারছ না/ মাটির ওপর এক ভয়ঙ্কর কালো আকাশ।/ এখন ও বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে বসে/ আছে।/ তুমি যেভাবে পারো এই পাথরটাকে সরিয়ে/ দাও।

যদিও তিনি ছন্দে নিজের কান আর অভিজ্ঞতাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে বলতেন। পোশাক-আসাকে সহজ সরল জীবন যাপন করা সরল মনের কবি বিশ্বাস করতেন, কবি যতই শক্তিমান হোন না কেন, তাকে ভালো মানুষ হিসেবে ভালো হতে হবে। কিন্তু সেই ভালো মানুষ কবিকেও যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে অর্থাৎ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮৫ সালের ১১জুলাই মাত্র ৬৫ বৎসর বয়সে অকালে কলকাতার মায়া ত্যাগ করে অজানা কোনও কাব্য-জগতের উদ্দেশে ভ্রমণে চলে গেলেন। তাঁর শুভ এই শতবর্ষের জন্মের মাসে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানিয়ে লেখার ইতি টানলাম।