অন্য মাতৃত্ব: ভিন্ন স্বাদের গল্প -অলিভিয়া দাস

মৌ এর কলেজ থেকে হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে রোজই ৫টা থেকে সাড়ে ৫টা হয়ে যায়। কারণ অনার্সের ক্লাসগুলো এখন দেরি করে থাকে আর তাছাড়া সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। তাই সব মিলিয়ে মৌ এর খুব ব্যস্ততা যাচ্ছে এই কদিন। তাও এই ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় বের করে “উপহার” এ যায়। মৌয়ের বাড়ি বোলপুরে;পড়াশোনার জন্য কোলকাতার হোস্টেল এ থাকতে হচ্ছে। “উপহার” হচ্ছে মৌ এর খুব কাছের একটা জায়গা, যখনই যায় মনে হয় না যে আর হোস্টেলে ফিরে যায়। “উপহার” হলো একটা বৃদ্ধাশ্রম,যেখানে অনেক বয়জ্যেষ্ঠ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থাকেন  নিজের সংসার ছেড়ে। ভালোই আছে তারা এইখানে, নিজেরদের মতো করে এক অন্য জগৎ বানিয়ে নিয়েছে তারা।  মৌ সময় পেলেই সেখানে যায়। আজও গিয়েছিল মৌ। গিয়েই দেখে সবাই মনমরা হয়ে বসে আছে খাবার ঘরে। মৌ জিজ্ঞাসা করলো,“কি হয়েছে গো তোমাদের? এতো চুপ্চাপ বসে আছো কেন?”সমীর বাবু বললেন,-“আর বলিস না মৌ সীমাদির ছেলে বলেছে যে এবার সীমা দি কে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখবে।”-“ও এই ব্যাপার, এই জন্য তোমরা মনমরা হয়ে বসে আছো সবাই মিলে।”সীমা দেবী বললেন,-“তুই বুঝতে পারছিসনা মৌ।”-“কি বুঝতে পারছিনা দিদা? তুমিই তো এতো দিন বলতে যে তোমার ছেলের জন্য তোমার মন খারাপ করছে; আর এখন যখন তোমার ছেলে তোমাকে নিয়ে যেতে চাইছে তাহলে তুমি যেতে চাইছনা কেন দিদা?”-“না রে মৌ বাবান আমাকে ভালোবাসে বলে নিয়ে যাচ্ছে না।”-“তাহলে??”-“বাবান বৌমার কথাতে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।”-“বৌমার কথাতে নিয়ে যাচ্ছে মানে?”-“আর মানে!”,সীমা দেবী বললেন।দীপঙ্কর বাবু এবার বললেন,-“বুঝতে পারলি না মৌ,সীমা দির নাতি হয়েছে না!” এইবার মৌ পুরো বিষয়টা বুঝতে পারলো।যেহেতু সীমা দেবীর ছেলে এবং বৌমা দুজনেই চাকরি করে, তাই তাদের সদ্যজাত শিশুকে দেখাশোনা করার জন্য একজন babysitter -এর প্রয়োজন। আসলে বিদেশে সদ্যজাত শিশুকে দেখাশোনা করার জন্য babysitter রাখা যায়; কিন্তু সেটা খুবই ব্যয় সাপেক্ষ; তাই যে বৃদ্ধা মায়ের এতদিন কোনো খোঁজ কেউ নিচ্ছিলো না তার হটাৎ করেই খুব দরকার পড়েছে। মৌ এর খুব অবাক লাগে এইভেবে যে কি করে মানুষ এতো অমানবিক হয় যে নিজের মা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিতে পারে, যারা নিজের সবটুকু দিয়ে এতো বড়ো করলো, সমাজের যোগ্য করে তুললো! কিন্তু সত্যি কি তারা আজ সমাজের যোগ্য? সপ্তাহখানেক বাদে মৌ “উপহার”- এ গেলো; গিয়ে শুনলো যে সীমা দেবী বিদেশে যাওয়ার জন্য রাজি হয়েছেন।মৌ সীমা দেবীকে জিজ্ঞাসা করলো,-” দিদা তুমি যাচ্ছ তাহলে?তোমার ছেলের কাছে?-” হ্যাঁ রে মৌ যাচ্ছি।”-” তাহলে তুমি গত সপ্তাহে যে যাবে না বলছিলে?”-“আসলে কি জানিস মৌ ভেবে দেখলাম যে ছেলেটাকে তো ভালো শিক্ষায় দিয়েছিলাম, তাও তো সে ! যাকগে থাক সেসব কথা; তাই ভাবছিলাম যে নাতিটাকে সঠিক শিক্ষায় মানুষ করে তুলবো। সে যেন  মা বাবাকে কোনোদিন বোঝা না ভাবে, তারা বেশি কিছু চায় না; তারা শুধু সবার সাথে একসাথে থাকতে চায়, একটু সঙ্গ  চায়,কথা বলার মানুষ চায় ব্যাস আর কিচ্ছু না।”মৌ শুধু বললো,-” দিদা তোমার মাতৃত্বেই তোমার নাতি মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠবে দেখো।” এই কথাটা বলে মৌ আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। -সৃজনী